গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, একজন পূর্ণকালীন সরকারি কর্মচারী রাষ্ট্র থেকে নিয়মিত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত হন। বিধায়, চাকরিরত অবস্থায় সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া অন্য কোনো লাভজনক বা অলাভজনক বেসরকারি পেশা, ব্যবসা বা চাকরিতে যুক্ত হওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সাংবাদিকতা একটি স্বাধীন এবং ওয়াচডগ (Watchdog) পেশা হওয়ায়, সরকারি চাকরির সাথে এর সরাসরি স্বার্থের সংঘাত ঘটে। ফলে, একই সাথে উভয় পেশা পরিচালনা করা আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ (বিধি-২২) অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী তার বিভাগীয় প্রধানের পূর্বানুমোদন ছাড়া গণমাধ্যমের (বেতার, টেলিভিশন, সংবাদপত্র বা অনলাইন) সাথে সরাসরি কথা বলতে, সাক্ষাৎকার দিতে, কোনো মতামত প্রকাশ করতে বা নিজস্ব নামে কোনো নিবন্ধ/চিঠি প্রকাশ করতে পারবেন না।
বেসরকারি কর্মসংস্থান বা ব্যবসা নিষেধাজ্ঞা (বিধি-১৭) অনুযায়ী,কোনো সরকারি কর্মচারী সরকারের অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি চাকরি বা অন্য কোনো লাভজনক পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবেন না। যেহেতু সাংবাদিকতা একটি নিয়মিত পেশা এবং এর বিপরীতে সম্মানী বা বেতন কাঠামো রয়েছে, তাই এটি এই বিধির আওতায় সরাসরি নিষিদ্ধ।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ সংশোধিত এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী একই সাথে কোনো আর্থিক লাভজনক পদ বা বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতে পারবেন না। এই নীতিমালার ১১.১৭ ধারায় স্পষ্ট করে 'সাংবাদিকতা' এবং 'আইন পেশা'-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এটি অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এমপিও বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এমন কোনো পোস্ট, তথ্য বা খবর শেয়ার করতে পারবেন না যা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে বা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ভঙ্গ করে। সাংবাদিকতার মূল কাজই হলো তথ্য প্রকাশ ও সমালোচনা করা, যা এই নির্দেশিকার সাথে সাংঘর্ষিক।
সরকারি কর্মচারীরা ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ বা দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন দ্বারা দায়বদ্ধ থাকেন। অন্যদিকে, একজন সাংবাদিকের কাজ হলো তথ্য জনসমক্ষে আনা। একজন ব্যক্তি একই সাথে উভয় পদে থাকলে তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি থাকে।
সরকারি কর্মচারীদের নীতিগতভাবে সরকারের প্রতি অনুগত থাকতে হয়। কিন্তু সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নিরপেক্ষ থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার বা অনিয়ম তুলে ধরা। দুটি ভিন্ন ধারার কাজ একজন মানুষের পক্ষে একসাথে করা অসম্ভব।
বিসিএস (তথ্য) ক্যাডার বা সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়, প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (PIB), বাংলাদেশ বেতার বা বাংলাদেশ টেলিভিশনে কর্মরত সাংবাদিকতা ব্যাকগ্রাউন্ডের কর্মকর্তারা সরকারের নীতিমালা প্রচারের উদ্দেশ্যে সাংবাদিক বা তথ্য কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। তবে এটি তাদের সম্পূর্ণ সরকারি দায়িত্ব, কোনো বেসরকারি মিডিয়ার সাংবাদিকতা নয়।
সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে কোনো কর্মকর্তা যদি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক বা শৈল্পিক কোনো কলাম বা ফিচার লেখেন (যার সাথে সরকারের নীতির কোনো সংঘাত নেই), তবে তা বিশেষ বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে এর জন্য প্রেস আইডি কার্ড বা কোনো মিডিয়ার নিয়মিত প্রতিনিধি হওয়া যাবে না।
যদি কোনো সরকারি কর্মচারী অনুমতি ছাড়া কোনো সংবাদপত্রের প্রতিনিধি বা সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন, তবে তা 'সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা' অনুযায়ী "অসদাচরণ" (Misconduct) হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি বা বেতন গ্রেড কর্তনসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে একজন নাগরিককে হয় পূর্ণকালীন সরকারি সেবা বেছে নিতে হবে, অন্যথায় স্বাধীন সাংবাদিকতা করতে হবে। সরকারি বেতনভুক্ত হয়ে সমান্তরালভাবে বেসরকারি সাংবাদিকতা করার কোনো সুযোগ বাংলাদেশের বর্তমান আইন ও নীতিমালায় নেই।


